 |
| মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়া |
 |
|

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কুষ্টিয়া জেলার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য ।
০৩ মার্চ কুষ্টিয়াতে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়।
১৯৭১ এর ১৭ই এপ্রিল তৎকালীন কুষ্টিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকা বৈদ্যনাথতলাতে (বর্তমান মেহেরপুরের মুজিবনগর)
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করেন। এই সরকারের নেতৃত্বেই নয় মাসব্যাপী বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়।
১১ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ কুষ্টিয়া চূড়ান্তভাবে দখলদারমুক্ত হয়।
|
|
|
 |
|
|
কুষ্টিয়ার খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা
কুষ্টিয়ায় ১০ জন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা আছেন। তাঁদের মধ্যে বীর উত্তম ২ জন, বীর বিক্রম ১ জন ও বীর প্রতীক ৭ জন।
বীর উত্তম ২ জন
. শহীদ গ্রুপ ক্যাপ্টেন শরাফ উদ্দিন আহমেদ বীর উত্তম, সুলতানপুর, কয়া, কুমারখালী, কুষ্টিয়া।
. শহীদ সিপাহী আবু তালেব বীর উত্তম, কালুয়া, কয়া, কুমারখালী, কুষ্টিয়া।
বীর বিক্রম ১ জন
. শহীদ সাইফুল্লাহ খালেদ তারেক বীর বিক্রম, কাঠদাহ, পোড়াদহ, মিরপুর, কুষ্টিয়া।
বীর প্রতীক ৭ জন
. শহীদ দিদার আলী বীর প্রতীক, আড়ুয়াপাড়া, কুষ্টিয়া।
. আব্দুল আলীম বীর প্রতীক, সাহাপুর, আব্দালপুর, কুষ্টিয়া।
. শহীদ মোঃ শামসুদ্দিন বীর প্রতীক, মহিষাখোলা, চিথুলিয়া, কুষ্টিয়া।
. শহীদ কে. এম. রফিকুল ইসলাম বীর প্রতীক, গোলাপনগর, ভেড়ামারা, কুষ্টিয়া।
. শহীদ গোলাম ইয়াকুব আলী বীর প্রতীক, আড়ুয়াপাড়া, কুষ্টিয়া।
. শহীদ হাবিবুর রহমান বীর প্রতীক, শেরপুর, দৌলতপুর,কুষ্টিয়া।
. মেজর জেনারেল (অব.) আনোয়ার হোসেন বীর প্রতীক, জানীপুর, খোকসা, কুষ্টিয়া।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কুষ্টিয়াতে প্রথম শহীদ হন রনি রহমান
|
|
|
 |
|
|
কুষ্টিয়ায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস
১৯৭১ সমসাময়িক উত্তাল বাংলাদেশের ঢেউ বেশ ভালোভাবেই আছড়ে পড়ে কুষ্টিয়াতে। ১৯৭১ এ এদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে কুষ্টিয়া জেলার ভূমিকা ছিল নেতৃস্থানীয়। আমরা আমাদের প্রবন্ধ শুরুর সময়কাল হিসেবে বেছে নিয়েছি ১৯৭১ সালের মার্চ মাসকে।
১৯৭১ সালের ৩রা মার্চ কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজ মাঠে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জনসভায় লাল সবুজের ছয়টি তারা খচিত একটি পতাকা স্বাধীন বাংলার পতাকা হিসাবে উড়িয়ে দেন কুষ্টিয়া জেলা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ও জেলা ছাত্র লীগের সভাপতি আব্দুল জলিল। স্বাধীন বাংলার ইশতেহার পাঠ করেন কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক ও স্বাধীন বাংলা সেলের নেতা শামসুল হাদী। মারফত আলী, আব্দুল মোমেন, শামসুল হাদীর নেতৃত্বে গঠিত হয় জয়বাংলা বাহিনী। ২৩শে মার্চ কুষ্টিয়া হাইস্কুল মাঠে পূনরায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য(এমপিএ) গোলাম কিবরিয়া ও আব্দুর রউফ চৌধুরী জয়বাংলা বাহিনীর অভিবাদন গ্রহণ করেন। যুদ্ধের প্রস্তুতি চলতে থাকে। কুষ্টিয়ার প্রতিটি গ্রামে জয় বাংলা বাহিনী গঠিত হয়।
২৫শে মার্চ ১৯৭১ রাত পৌনে বারোটায় মেজর শোয়েবের নেতৃত্বে এবং ক্যাপ্টেন শাকিল, ক্যাপ্টেন সামাদ ও লেঃ আতাউল্লাহ শাহ এর উপঅধিনায়কত্বে ২৭ বেলুচ রেজিমেন্টের ডি কোম্পানীর ২১৬ জন সৈন্য কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন আক্রমন করে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের নিরস্ত্র করে। ডিউটিরত পুশিশেরা অস্ত্র নিয়ে পালিয়ে নদী পার হয়ে আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামে আশ্রয় নেয়। পাকিস্তানী সৈন্যরা পুলিশ লাইন, জেলা স্কুল, টেলিগ্রাফ অফিস, থানা ও আড়ুয়াপাড়া ওয়ারলেস অফিসে অবস্থান নেয়। তাদের কাছে M.M.R.R, S.M.G, L.M.G, H.M.G, অটোমেটিক চাইনিজ রাইফেল ও প্রচুর গোলাবারুদ ছিল ।
২৬শে মার্চ সমস্ত শহরে ২৪ ঘন্টার জন্য কারফিউ জারি করে পাক সেনারা শহরময় টহল দিতে থাকে। পরদিন ২৭ মার্চ বিকেলে ভাষা সৈনিক জনাব নজম উদ্দিন আহম্মেদ এর শ্যালক
রনি রহমান হানাদারদের উপর বোমা আক্রমন করতে উদ্যত হলে শহীদ হন। ২৮শে মার্চ কারফিউ ভঙ্গের পর কুষ্টিয়া পৌর বাজারের জনারণ্যে পাকসেনাদের নির্মম গুলিবর্ষণে বহুলোক আহত হয় ।
তৎকালীন এমএনএ আজিজুর রহমান আক্কাস, এমপিএ আব্দুর রউফ চৌধুরী, খন্দকার শামসুল আলম, এম এ বারী, অধ্যাপক নুরুজ্জামান, আনোয়ার আলী, আব্দুল মোমেন, শামসুল হাদী কুষ্টিয়ায় পাক আর্মির অবস্থান, সৈন্য সংখ্যা, অস্ত্রশস্ত্র সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে সাম্ভব্য আক্রমনের একটি নকসা তৈরি করে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও দৌলতপুর ইপিআরদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
আব্দুর রউফ চৌধুরীর নেতৃত্বে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা মাঙ্গন মিয়া সহ আরো কয়েকজন সেনা সংগ্রহের দায়িত্বে থাকেন।
কুষ্টিয়ার নেতৃবৃন্দের নকসার উপর ভিত্তি করে ২৮শে মার্চ রাতে চুয়াডাঙ্গায় ইপিআর সেক্টর মেজর আবু ওসমান চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরীর সঙ্গে কুষ্টিয়া আক্রমনের পরিকল্পনায় সিন্ধান্ত হয় ২৯শে মার্চ ভোর ৪টায় চারদিক থেকে কুষ্টিয়া আক্রমন করার। কথা থাকলেও ইপিআর বাহিনী সময়মত যথাস্থানে পৌছাতে না পারায় ৩০শে মার্চ ভোর ৪টায় যুদ্ধ শুরু হয়।
সুবেদার মোজাফ্ফরের নেতৃত্বে একদল ইপিআর আনসার পুলিশ বাহিনীর সদস্যগন ও জয় বাংলা বাহিনীসহ ছাত্র জনতা পুলিশ লাইন সংলগ্ন জজ সাহেরের বাড়ী ও আশে পাশে অবস্থান নেন।
ট্রাফিক মোড়ে রউফ চৌধুরির বাড়ী হতে থানা ও টেলিফোন এক্সচেন্জ অফিসে হানাদার বাহিনীর অবস্থানে আক্রমন করার জন্য জাহেদ রুমী, শামসুল হুদা সহ ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের ছেলেরা এবং ২৫শে মার্চ হরিপুরে আশ্রয় নেয়া পুলিশ সদস্যগণ অবস্থান নেন।
কমলাপুরের অবস্থানরত ইপিআর বাহিনী আড়ুয়া পাড়া ওয়ারলেস অফিসের দক্ষিণপূর্ব ও পশ্চিম দিকে অবস্থান নেয়। নুর আলম জিকু, আবুল কাশেম ও এ্যাডভোকেট আব্দুল বারী ছাত্র, জনতা, ইপিআর, পুলিশ, আনসার, জয় বাংলা বাহিনী নিয়ে ওয়ারলেস অফিসের দক্ষিণপূর্ব দিকে অবস্থান নেন।
ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরী, ডিসি (ফুড) সাহেবের বাড়ীতে বসে যুদ্ধ পরিচালনা করতে থাকেন।
৩০শে মার্চ ভোর ৪টায় পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক ভেড়ামারা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে কুষ্টিয়া শহরকে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন করার পর একটি ওপেনিং ফায়ারের সঙ্গে সঙ্গে কুষ্টিয়ার চারদিক থেকে পাক সেনাদের উপর আক্রমন করা হয় ।
তাদের অত্যাধুনিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে সামান্য রাইফেল কয়েকটি এল.এম.জি আর অফুরন্ত মনোবল অদম্য সাহস ও দেশপ্রেম নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। হাজার হাজার বাঙালি লাঠি, ফালা, সড়কি নিয়ে সমস্ত কুষ্টিয়া শহর ঘিরে জয় বাংলা ধ্বনি দিতে থাকে। এতে পাকিস্তানী হানাদারদের মনোবল ভেঙ্গে পড়ে পরবতীতে মুক্তিবাহিনীর প্রচন্ড আক্রমনে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পুলিশ লাইন, ওয়ারলেস অফিস ও থানা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে। বহু হানাদার সেনা নিহত হয়। অফিসার সহ বেশ কিছু সৈন্য জেলা স্কুলে আশ্রয় নেয় । শুধু জেলা স্কুল বাদে কুষ্টিয়া শহর শক্রমুক্ত হয়। জেলা স্কুল অবরোধ করে রাখে মুক্তি বাহিনী। হানাদাররা যশোর ক্যান্টনমেন্টের সাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হয় । ৩১শে মার্চ একটি বিমান এসে জেলা স্কুলের আশে পাশে এইচ.এম.জির গুলি বর্ষণ করে চলে যায় ।
১লা এপ্রিল ভোরে সব অফিসার সহ ৪০/৫০ জন পাকিস্তানী সেনা একটি ডজ গাড়ি ও দুইটি জিপে উঠে গাড়ির লাইট বন্ধ রেখে পালাতে চেষ্টা করে। গেট থেকে বের হওয়া মাত্র ইপিআরদের ফাঁদে পড়ে প্রথম জীপটির সবাই হতাহত হয় এবং বাকি ২টা গাড়ি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ঝিনাইদহ রোড হয়ে এই পলায়ন কালে গাড়াগঞ্জ ব্রিজের মুখে ফাঁদ তৈরি ছিল। তীব্র গতিতে পালিয়ে যাবার সময় ১টি জীপ এই গর্তে পড়ে যায়। সৈন্য সহ মেজর শোয়েব ও অন্য অফিসাররা আহত ও নিহত হয়। ডজ গাড়িটি থামিয়ে অন্যরা আশেপাশের গ্রামে পালিয়ে যেতে চেষ্টাকালে লেঃ আতাউল্লাহ শাহ তার সব সৈন্য সহ গ্রামবাসীদের হাতে ধরা পড়ে এবং ফালা,সড়কি,রামদার আঘাতে আহত ও নিহত হয়।
১লা এপ্রিল বাংলাদেশের মধ্যে কুষ্টিয়া প্রথম শক্রমুক্ত হয়। বাংলাদেশের মধ্যে একমাত্র কুষ্টিয়া জেলা ১৬ দিন শত্রুমুক্ত থাকে। সে কারণে দেশবরেণ্য নেতৃবৃন্দ এই জেলাতে আসতে পারেন এবং ১৭ই এপ্রিল সরকারের শপথ গ্রহণ সম্ভব হয়। এই যুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে নারীরাও অসীম উদ্দীপনায় এগিয়ে এসেছিলেন।
এই যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ৬ জনের পরিচয় জানা যায়।
১।হামেদ আলী - পিতা ওমোদ আলী গ্রাম দুধ কুমড়া, কুমারখালী
২।দেলোয়ার হোসেন -পিতা আলম হোসেন গ্রাম ও থানা মিরপুর ।
৩।খন্দকার আব্দুর রশিদ -পিতা আব্দুর রহমান গ্রাম বামন পাড়া, মেহেরপুর ।
৪।ফজলুর রহমান -পিতা নাসির উদ্দিন গ্রাম মেহেরপুর ।
৫। আশরাফ আলী খান - পিতা হাছেন আলী খান গ্রাম মশান, মিরপুর ।
৬। গোলাম শেখ - পিতা নজীর শেখ গ্রাম মশান, মিরপুর ।
আব্দূল মোমেন (পিতা আব্দুল করিম কোটপাড়া, কুষ্টিয়া), আনসার আলী (পিতা আজগর আলী গ্রাম চাপাইগাছি, কুষ্টিয়া ) সহ আরো অনেকে আহত হন।
১লা এপ্রিল শক্রমুক্ত হলে ইপিআর বাহিনী পাকসেনাদের ফেলে যাওয়া বেশকিছু অস্ত্র গোলাবারুদ গাড়ি নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় চলে যায়। কুষ্টিয়া মুক্তিবাহিনীর হেফাজতে থাকে। ৩রা এপ্রিল এমএনএ জনাব আজিজুর রহমান আক্কাসের সভাপতিত্বে সর্বদলীয় সভায় এমপিএ জনাব এ্যাডভোকেট আহসানুল্লাহকে আহবায়ক করে “কুষ্টিয়া স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিষদ” গঠিত হয়। উক্ত কমিটির অন্যতম সদস্য এম.এ.মজিদকে(বীমা ব্যক্তিত্ত্ব) আহবায়ক করে এমপিএ জনাব আব্দুর রউফ চৌধুরী, আব্দুল জলিল, শামসুল হাদী সহ তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের সহযোগীতায় কুষ্টিয়া ডাক বাংলোতে শান্তি শৃঙ্খলা ও বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়।
৩১শে মার্চে পাকসেনারা পূর্ব পাকিস্তানের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কুষ্টিয়া টেলিফোন অফিসের কিছু অংশ ধ্বংস করে দিয়ে যায়। ৩রা এপ্রিল লন্ডন টাইমসে ফলাও করে কুষ্টিয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় ইতিহাস ছাপা হয় যা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিল । চূড়ান্ত বিজয়ের আগ পর্যন্ত কুষ্টিয়াতে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকসেনাদের মধ্যে অসংখ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয় ।
মানবিক কারনে মুক্তিযোদ্ধারা অবাঙালি ও বিহারীদের কোন ক্ষতি করেনি । নিরাপত্তার জন্য তাদেরকে জেলখানায় রাখা হয় । এই অবাঙালিরা পরবর্তীতে পাকিস্তানী সৈন্য ও রাজাকারদের সঙ্গে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছিল ।
সড়ক ও রেলপথে আক্রমনে ব্যর্থ হয়ে পাকহানাদার বাহিনী আকাশ পথে কুষ্টিয়া আক্রমন করে । ১১ই এপ্রিল পাকিস্তানী বিমান বহর কুষ্টিয়া ও কুমারখালীর উপর হামলা করে । বহু বাঙালি মৃত্যুবরণ করে । ১২ই এপ্রিল পুনরায় বিমান হামলা হলে মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা গুলিবর্ষনে একটি পাকিস্তানী জঙ্গী বিমান জেলখানার উপর ভেঙ্গে পড়ে বিধ্বস্ত হয় । ১৫ এপ্রিল বিমান বহরের কভারে পাকসেনাদের পদাতিক বাহিনী যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বিশাখালী পর্যন্ত পৌছে আরেক পদাতিক বাহিনী ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে নগরবাড়ী ঘাট পার হয়ে পাকশি ব্রিজের অপর পাড়ে এসে অবস্থান নেয় । উভয় জায়গাতে মুক্তিবাহিনীর সাথে তুমূল যুদ্ধ হয় । পাকসেনাদের মটার এইচ এমজি সহ অত্যাধুনিক ভারী অস্ত্রের গোলার মুখে মুক্তিবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং পিছু হটতে বাধ্য হয়। পাকহানাদার বাহিনী কুষ্টিয়ার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে ।
১৭ই এপ্রিল পাকিস্তানী বিমান হামলা প্রচন্ড আকার ধারন করে । বিমান বাহিনীর ছত্রছায়ায় পাকবাহিনী ভেড়ামারা-কুষ্টিয়া সড়কের দুই ধারে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সাধন করে । বহু ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে পুড়িয়ে তারা শত শত বেসামরিক নিরীহ বাঙালীকে হত্যা করে কুষ্টিয়া দখল করে।
১৬ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পাকিস্তানী সৈন্যরা কুষ্টিয়া জেলার প্রায় ২০ (বিশ) হাজার মানুষকে হত্যা করে। তারা শুধুমাত্র কুষ্টিয়া শহর থেকেই প্রায় চল্লিশ কোটি টাকার সম্পদ লুট করে।
বিশ্ব ব্যাংকের এক রিপোর্টে মে ' ১৯৭১ এর কুষ্টিয়া সম্পর্কে বলা হয়, শহরের প্রায় ৯০ ভাগ বাড়ি, দোকান, ব্যাংক প্রভৃতি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়েছে ।
এই প্রতিরোধ যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন:
১। ইন্তাজ আলী
২। আনসার আলী
৩। হাসান ফয়েজ
৪। সবুর মিয়া
৫। সামসুল হুদা
৬। হামিদ খান এবং আরো অনেকে।
কুষ্টিয়া, পাবনা, ফরিদপুর ও যশোর জেলা ৮নং সেক্টর গঠন করা হয়। প্রথমে এর সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী এবং পরবতীতে মেজর এম.এ. মঞ্জুর । এ অঞ্চল দক্ষিণ পশ্চিম জোনাল কাউন্সিলের অন্তর্ভূক্ত হয়, যার চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন আব্দুর রউফ চৌধুরী। এই কাউন্সিল জনগণকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে তুলতে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দিত।
বংশীতলার যুদ্ধঃ
দূর্বাচারা গ্রামে জিয়াউল বারী নোমানের নেতৃত্বে বি এল এফ এর একটি দল ছিল। তাদের পৃথক ক্যাম্প ছিল। এমন একটি ক্যাম্পের প্রধান ছিলেন শামসুল হাদী। ৫ই সেপ্টেম্বর তার অনুপস্থিতিতে ক্যাম্প ইনর্চাজ ছিলেন শাহাবুব আলী ও বাহার তাদের নেতৃত্বে প্রায় ২০০মুক্তিযোদ্ধা ছিল। রাজাকার বাহিনী কুষ্টিয়ার পিস কমিটিকে জানিয়ে দেয়। পিস কমিটি আর্মি ক্যাম্পে জানালে পাকিস্তানী বাহিনী ভাদালিয়া হয়ে দূর্বাচারার দিকে অগ্রসর হয় । পাকসেনা আসছে এ খবর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে পৌছে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা দূর্বাচারার ২ মাইল পশ্চিমে বংশীতলায় মধ্যরাত থেকে এ্যাম্বুশ করে। পরদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত পাকিস্তানীদের খোঁজ না পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা নাস্তা করার জন্য অবস্থান ছেড়ে উঠে যায় । এল এম জি ম্যান আব্দুল কুদ্দুস ও সেকেম আলী বংশীতলার ইক্ষু ক্রয় কেন্দ্রের পূর্ব দিকে অবস্থান নিলে পাকিস্তানী সেনাদের পায়ে হেটে এগিয়ে আসতে দেখে। পাকিস্তানী সৈন্যরা খুব কাছাকাছি চলে আসলে আব্দুল কুদ্দুস এলএমজির ব্রাশ ফায়ার করে দেয়। হঠাৎ আক্রমনে পাকিস্তানীরা হতভম্ভ হয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমন করতে পারে না। ঘটনাস্থলে বহু পাকিস্তানী নিহত হয়। বিরতিহীন গুলিবর্ষণে আব্দুল কুদ্দুসের এলএমজি জ্যাম হয়ে যায়। এই সুযোগে পাকিস্তানী সৈন্যরা গুলি করে। বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুস পায়ে গুলি বিদ্ধ হন। তারপরও তিনি এলএমজি টি পানিতে ফেলে দিয়ে সঙ্গী সেকেম আলী সহ ডুব সাঁতার দিয়ে পাকিস্তানী সৈন্যদের নাগালের বাইরে চলে যান। এই সময়ে মধ্যে অন্য মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে এসে গুলিবর্ষণ শুরু করে। বংশীতলা হতে ৩ মাইল দুরে কুষ্টিয়া টেক্সটাইল মিলে অবস্থানরত পাকিস্তানী সৈন্যরা সেল নিক্ষেপ শুরু করে। দীর্ঘক্ষণ যুদ্ধ চলার পরে উভয় পক্ষ পিছু হটতে থাকে। এই যুদ্ধে ৪৫/৫০ জন পাকিস্তানী সৈন্য ও কয়েক জন অফিসার নিহত হয়।
বংশীতলার যুদ্ধে শহীদ হনঃ
১। তাজুল ইসলাম -পিতা আব্দুল করিম শেখ গ্রাম দূর্বাচারা, কুষ্টিয়া ।
২। খোরশেদ আলম দিল -পিতা শাদ আহমদ গ্রাম গোপালপুর, কুষ্টিয়া ।
৩। শেখ দিদার আলী- পিতা নূরুল ইসলাম গ্রাম আড়ুয়াপাড়া, কুষ্টিয়া ।
৪। ইয়াকুব আলী শেখ- পিতা কুদরত আলী শেখ গ্রাম কালিশংকরপুর, কুষ্টিয়া ।
৫। গোলাম মোসত্মফা রাজ্জাক -পিতা মোহাম্মদ আলী শেখ গ্রাম আড়ুয়াপাড়া কুষ্টিয়া ।
৬। আবু দাউদ- পিতা ইয়াদ আলী গ্রাম দেশওয়ালীপাড়া, কুষ্টিয়া ।
৭ । চাঁদ আলী মোল্লা গ্রাম বংশীতলা, কুষ্টিয়া ।
৮। আব্দুল মান্নান -পিতা মোজাহার উদ্দিন গ্রাম বানিয়াখড়ি,কুষ্টিয়া ।
৯। মোবারক মোল্লা
আ ক ম আজাদ(পিতা-মোঃ শামছুদ্দিন, পিয়ারপুর, কুষ্টিয়া), শফিউল ইসলাম জিল্লু (পিতা আমিরুল ইসলাম,কেনীরোড়,কুষ্টিয়া),
মতিয়ার রহমান ( গ্রাম মনোহরদিয়া), ফিরোজ আহম্মেদ (আমলাপাড়া কুষ্টিয়া), হাবিবুর রহমান (শেরকান্দি, কুমারখালী), আব্দুল কুদ্দুস (মঙ্গল বাড়ীয়া, কুষ্টিয়া ), আব্দুল খালেক (হাটস হরিপুর, কুষ্টিয়া ) সহ আরো অনেকে আহত হন ।
পরদিন পাকিস্তানীরা বংশীতলা দূর্বাচারা ও আশেপাশের এলাকায় বিমান হামলা করে।
এছাড়াও শেরপুর যুদ্ধ ছিলো স্মরণীয় ঘটনা।
যুদ্ধকালীন সময়ে এ্যাডভোকেট সাদ আহম্মেদের নেতৃত্বে পিস কমিটি গঠন ও রাজাকার সৃষ্টি করে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।
৯ই ডিসেম্বর কুষ্টিয়া শহর বাদে সমগ্র কুষ্টিয়া (১ ডিসেম্বর মেহেরপুর ও ৭ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গা ) মুক্ত হয়ে যায়। কুষ্টিয়া শহর মুক্ত করার জন্য মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী কুষ্টিয়া শহরের চারিদিক থেকে আক্রমন শুরু করে। যশোর ক্যান্টনমেন্ট এবং ঝিনাইদহ সাব ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানী সৈন্য কুষ্টিয়া শহর দিয়ে, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরের সৈন্য পোড়াদহ দিয়ে এবং দৌলতপুরের সৈন্য ভেড়ামারা দিয়ে পাকশী ঘাটে সমাবেত হয়। ব্রিজের উপর দিয়ে, নৌকায়, ফেরিতে করে ব্রিজের পূর্ব পাশ থেকে যাত্রা শুরু করে এমন সময় মিত্রবাহিনীর বিমান হতে বোম্বিং শুরু হয়। মিত্রবাহিনীর বোমার আঘাতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কিছু অংশ ভেঙ্গে যায় বহু পাকিস্তানী সৈন্য ও তাদের তাবেদার রাজাকার বাহিনী নিহত হয় ।
রণক্ষেত্রে যখন বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা হাতে অস্ত্র নিয়ে বীরত্বের সঙ্গে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার আল বদর জামায়াত ও মুসলিম লীগের দালালদের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে যুদ্ধরত তখন কিছু বাঙালী হাতে কলম তুলে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাড়িয়ে ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্য ও পাক হানাদারদের কার্যক্রম তুলে ধরতে তারা বহু পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। এই ধরনের একটি পত্রিকা স্বাধীন বাংলা। স্বাধীন বাংলা বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা। কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খন্দকার শামছুল আলম দুদুর প্রকাশনায়, সাপ্তাহিক মশাল সম্পাদক ওয়ালিউল বারী চৌধুরীর সম্পাদনায় ও সাপ্তাহিক দর্শক সম্পাদক লিয়াকত আলীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদনায় মুজিবনগর থেকে ১লা মে স্বাধীন বাংলা নামের সাপ্তাহিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।
কুষ্টিয়ার শরণার্থীদের সাহায্যার্থে নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে মুক্তিযোদ্ধা সহায়ক সমিতি নামে একটি সংগঠন মে থেকে জুলাই পর্যন্ত কাজ করে, যার আহবায়ক ছিলেন লিয়াকত আলী ।
যুদ্ধের মধ্যেও রাজনীতির প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য নদীয়ার রানাঘাটে জনাব আহসানউল্লাহ এমপিএকে অধ্যক্ষ এবং তৎকালীন জেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ প্রধান আনোয়ার আলী ও ছাত্রনেতা খন্দকার রশিদুজ্জামান দুদুকে শিক্ষক নিয়োগ করে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তিনমাস মত পরিচালিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট হিসাবে কাজ করেছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ও কলাকুশলিরা অধিকাংশ ছিলেন কুষ্টিয়ার। সুরসেনা আব্দুল জব্বারের কন্ঠে দেশাত্ববোধক গান মুক্তিযোদ্ধারে প্রেরণা যুগিয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতারের জল্লাদের দরবার অনুষ্ঠানটির কথা মনে হলে সকলের মানসপটে ভেসে উঠে রাজু আহম্মেদ ও বাবুয়া বোসের নাম । জল্লাদের দরবার অনুষ্ঠানটির রচয়িতা কুষ্টিয়ার কল্যাণ মিত্র। আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাম আমিনুল হক বাদশা।
এদেশের মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়া জেলার যাঁদের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে তাঁরা হলেন লাখো লাখো স্থানীয় জনগনসহ আজিজুর রহমান আক্কাস (তৎকালীন এমএনএ), ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম (তৎকালীন এমএনএ ও প্রধানমন্ত্রীর পিএস), আব্দুর রউফ চৌধুরী (তৎকালীন এমপিএ), ব্যারিস্টার বাদল রশিদ (মুক্তিযুদ্ধে লিয়াজো অফিসার), সহিউদ্দিন আহম্মদ, আহসান উল্লাহ (তৎকালীন এমপিএ), গোলাম কিবরিয়া (তৎকালীন এমপিএ), নুরুল হক (তৎকালীন এমপিএ), এ্যাডভোকেট ইউনুস আলী (তৎকালীন এমপিএ), শামসুল হক (তৎকালীন ডিসি,কুষ্টিয়া), তৌফিক এলাহী চৌধুরী (তৎকালীন এসডিও,মেহেরপুর), ডা. আসাবুল হক(তৎকালীন এমপিএ এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী সরকার পরিচালিত বাংলাদেশ রেডক্রসের চেয়ারম্যান) প্রমুখ।
|
|
|
 |
|
|
সার্বিক কৃতজ্ঞতা ও তথ্যসূত্র:
আব্দুর রউফ চৌধুরী
এ্যাডভোকেট লিয়াকত আলী
নাছিম উদ্দিন আহম্মেদ
প্রফেসর মোঃ আমান উল্লাহ বিশ্বাস
শাহাবুব আলী
সামসুল বারী
দিলীপ কুমার সাহা
মাসুম রেজা জয়
কুষ্টিয়ার ইতিহাস - শ.ম. শওকত আলী
কুষ্টিয়ার ইতিহাস ঐতিহ্য মুক্তিযুদ্ধ - এ্যাডভোকেটশামসুল হুদা
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা ঐক্য পরিষদ ।
|
|
|
 |
|
এই পাতাতে থাকবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কুষ্টিয়ায় সংঘঠিত বিভিন্ন যুদ্ধ, অপারেশন, প্রতিরোধ এবং আরো অন্যান্য তথ্য, ছবি।
আমরা পর্যায়ক্রমে সকল তথ্য পরিবেশন করবো।
আপনাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত কোন তথ্য, ছবি থাকলে তা আমাদের কাছে পাঠান।
আপনাদের এ সহযোগীতা কুষ্টিয়ার তথ্য ভান্ডারকে আরো সমৃদ্ধ করবে আশা রাখি। - কতৃপক্ষ
|
|
|
 |
|
| |